আমি তো পঙ্গু, আমি অভিশপ্ত

তখন আমি অনেক ছোট হামাগুড়ি দিয়ে চললাম। ধীরে ধীরে দুই পায়ে ভর করে হাটতে শুরু করলাম। একটু একটু করে বড় হতে লাগলাম। খেলাধুলা খুব ভালোবাসি। তাই, যখন ছোট ছিলাম তখন আমাকে তিন চাকার ছোট একটা গাড়ি কিনে দেওয়া হলো… আমি বিকাল বেলা আমার বন্ধুদের সাথে চালাতাম। খুবই ভালো লাগতো। তারপর আরো একটু বড় হলাম। ইচ্ছা করলো সাইকেল চালাতে, কিন্তু বাবা কিনে দেয় না। তারপর আরো একটু বড় হলাম, অনেক জোড়াজোড়ি করলাম, কিনে দিতেই হবে, বাবা সুন্দর একটা স্টাইলিশ সাইকেল কিনে দিলো, আমি বন্ধুদের সাথে রেসিং এর জয়েন করতাম। স্কুল ছুটি হলেই… সাই সাই করে… গতির ছিলো আমার প্রিয়… আরো ফাস্ট… আরো…কোন এক দুপুর বেলা… সাইকেল রেসিং আর… হঠাত একটা এক্সিডেন্ট, কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফিরে কিছু বুঝতে পারলাম না। সব কিছূ কেমন যেন, সাদা-কালো রং নিয়ে খেলা করছে। একটু পড়ে বুঝতে পারলাম, আমি হসপিটালে। শরীরে তেমন কোন শক্তি পাচ্ছিলাম না। দুই পা কেমন যেন ভারী ভারী লাগছে। দেখলাম পা থেকে বুক পযর্ন্ত সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মা পাশেই ছিলো। ধরে বসিয়ে দিলো। পা খুব ভারি লাগছে, এমন লাগছে কেন, দেখার জন্যে কাপড়টা সরিয়ে দেখি আমার পা দুটো নেই। আমি চিতকার করে উঠি… ও… মা… মা… আমার পা কোথায়? ডাক্তার কি করছে… কি করছে… কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই একটা র্নাস শরীরে একটা ইনজেকশন দিলো… দুই চোখে ঘুম ভেঙ্গে আসলো… আবার আমি অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে রইলাম।

আবার সন্ধার দিকে ঘুম ভাঙ্গলো। আস্তে আস্তে আমি সব বুঝতে পারলাম। সব। আর বাকি কিছুই রইলো না। দুই চোখ দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পানি পড়তে থাকলো। আর মা একটা কাপড় দিয়ে চোখ এর পানি মুছে দিতে লাগলো। সবাই আমার পাশে দাড়িয়ে আছে, কিন্তু কেউ কোন কথা বলে না… মনে হয় বোবা হয়ে গেছে…

বাসায় ফিরে আসলাম। বাসায় পরিবেশটা কেমন যেন? সব কিছু নতুন লাগছে। মনে হয় সবাই আমার সাথে অভিনয় করছে। আমি বুঝতে পারি সব। কিন্তু এ অভিনয় শুধু আমাকে আনন্দ দেওয়ার জন্যেই… আমি জানি, আমি সব বুঝতে পারি, সব। সব কিছূ আমার কাছে স্পষ্ট…

সময় গড়াতে লাগলো। আমার সারাজীবন এর ঘনিষ্ট বন্ধু হলো একটা হইল চেয়ার। ওর সাথে আমি খেলা করি। তবে আর রেসিং খেলতে পারি না। স্কুল এ আমার বন্ধু গুলো কেমন যেন আমার থেকে দুরে চলে যেতে লাগলো… আমি সবকিছু বুঝতে পেরেছি… আমি তো এখন … সবার সাথে মানিয়ে চলার ক্ষমতা আমার নাই। আমার বেস্ট ফ্রেন্ডও টাও কেমন যেন হয়ে গেল। একটা বন্ধু ছিলো, ওর আমার জন্যে অনেক কষ্ট করেছে, আমি ক্লাসে আসতে না পারলে ও আমার জন্যে সব গুলো লেখা লিখে রাখতো, যেন আমার কষ্ট কম হয়। ও আমার থেকে দুরে চলে গেছে। আমি এখন একটা বোঝা সুরূপ। কষ্ট ছাড়া কিছুই দিতে পারবো না। একাকীত্ব আমার বন্ধু, আর সময় শত্রু…

কিছুই চিন্তা করতে পারছি না। কি করবো। চিন্তা করতে লাগলাম। আপন করে নিতে লাগলাম, ভাচৃর্য়াল সর্ম্পক কে। অনলাইনে বন্ধুত্ব হতে লাগলো। অনেক অনেক বন্ধু… সবাই কত্ত ভালো… অনেক এর সাথে কথা হয়, অনেক এর সাথে অনেক ভালো সর্ম্পক। অনেকের সাথে দিনে একবার কথা না হলে ভালো লাগে না। আর অনলাইনে তো কেউ কেউকে দেখে না, সুতরাং …। কিন্তু সবার সাথে তো দেখা করতে পারি না… যাওয়া সম্ভবও না…

আমার একটা বন্ধু আছে। ও ইন্ডিয়ায় থাকে। ঈদে এবার গিফট পাঠাবে। দেশে আসবে আমার সাথে দেখা করার জন্যে। কিন্তু আমি যে করি, আমার ও ইন্ডিয়া যেতে ইচ্ছা করে। আমি জানি, হয়তো আমাকে দেখে ওর মন খুব খারাপ হয়ে যাবে, হয়তো ওর সাথে আমি প্রতারণা করেছি, হয়তো আমি আমার অনেক কিছু লুকিয়েছি, হয়তো ওর সাথে ঐ দিনই আমার সর্ম্পক এর শেষ, আমি জানি শেষটা ভালো হবে না… বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে, হয়তো দুই চোখে কোনের কিছু পানি চলে আসবে… এই তো…। কিন্তু আমি তো অসহায়… এত্ত ভালো একটা বন্ধু কখনই পেতাম না… কিন্তু যখন পেলাম তখন আমার কি অবস্থা… সবই আমার ভাগ্য। মেনে নিয়েছি সব… সময় তো বহিয়া চলে… আমাকেও চলে যেতে হবে…

সবাই তো সবার দুঃখকে নিয়ে আছে। নিজের দুঃখটা কে সব সময় বড় মনে করে, আমার মত দুঃখী মানুষ বুঝি আর নাই। একজন মৃতুø পথযাত্রীর কথা শুনার সময় নাই যেখানে… সেখানে আমার কথা… এই তো ঐদিন অনলাইনে একজন বিদায় নিলো… হয়তো উনি মৃতুøর সাথে যুদ্ধ করছে… হয়তো চলে গেছে… আর তো অনলাইনে দেখি না… কখনোও না…

একটু ভালোবাসাই তো চেয়েছিলাম, একটু সাহায্য চেয়েছিলাম-একটু ভর করে হাটবো-একটু দুরে চলে যাবো, একটু আশার আলো চেয়েছিলাম, একটু সাহস চেয়ে ছিলাম। কিন্তু সবাই দুরে ঠেলে দেয়, করুণার পাত্র হয়ে গিয়েছি তো। ভালোবাসার নামে কষ্ট আর ছলনা, সাহায্য এর নামে সময় নাই, আশার নামে আরো হতাশাগ্রস্ত করা, এই তো…

কিন্তু কখনোও কি নিজেকে প্রশ্ন করে দেখেছেন, আসলে একজন অসহায় মানুষ আরেক জন্য সহায় মানুষ এর কাছ থেকে কি চায়?

লেখক: মো: সাকিব আল মাহমুদ
সোর্স: আমি তো পঙ্গু, আমি অভিশপ্ত

Leave a Comment

Filed under sakib's blog

… In Adda

… In Adda এ স্বাগতম !

আমরা যারা নিয়মিত somewhereinblog/blogger/wordpress/livejournal/
protopage
/xanga/vox/yahoo
আরো অনেক ব্লগ সাইট এ যারা নিয়মিত ব্লগিং করে থাকি অনেক সময় অনেক ভালো ভালো লেখক/লেখিকার লেখা পড়ে থাকি লেখা গুলো কখনোও বাংলায় বা কখনোও ইংরেজীতে হয়ে থাকে লেখা গুলো একটা সাইট এ দেখার জন্যেই ...In Adda. তবে এখানে অধিকাংশ লেখাই বাংলায় প্রকাশিত হয়ে থাকবে

সময়ের সাথে সাথে লেখা গুলো হারিয়ে যায় একটা সময় আর মনেও থাকে না আবার যখন খুজেঁ বের করতে চাচ্ছি তাও পাচ্ছি না এর জন্যে চিন্তা করলাম ভালো লাগা, কষ্ট লাগা, খুব হাস্যকর, ছোট গল্প, কৌতুক, পর্ব, তথ্য প্রযুক্তি আরো অনেক দিক দিয়ে মানসম্পন্ন এবং সবার কাছে গ্রহন যোগ্য এই ধরণের লেখা এখানে প্রকাশ করার চেষ্টায় …In Adda.

লেখার পাশাপাশি ব্লগার এর ব্লগ সাইট এ্যডেসও প্রকাশিত হয়ে থাকবে খুব সহজে সাইডবার ক্যাটাগরী থেকে নিজের লেখা গুলোও খুজেঁ পাওয়া যাবেআর লেখা Submit করার জন্যেও ব্যবস্থা করা হয়েছে

প্রতি সপ্তাহে যেকোন একজন বা দুইজন ব্লগার এর ব্লগ সাইট নিয়ে আলোচনা হবে Blog Of The Week বলতে পারেন এবং সাইড বারে ব্লগার এর rss ও থাকছেবাংলাদেশী ব্লগার হিসেবে প্রথম সারির ব্লগার নিয়েও এখানে আলোচনা করা যেতে পারে? খুব সহজে ভালো ভালো ব্লগার এর খবরও পাওয়া যাবেকেমন হবে বলতো?

আর নতুন কোন আপডেট বা নতুন আরো আইডিয়া নিয়েও এখানে …In Adda এখানে আড্ডা হবেসার্চ ইঞ্জিন গুলো যেন আমাদের লেখা গুলো সহজে খুজেঁ পায় তার জন্যে somewhereinadda.blogspot সাইট রয়েছেআর কি কি করা যায় বলুন তো?

সকলের সহায়তা আশা করছি

সবাইকে ধন্যবাদ

… In Adda

Leave a Comment

Filed under ...In Adda

Hello world!

Welcome to WordPress.com. This is your first post. Edit or delete it and start blogging!

১ টি মন্তব্য

Filed under uncategorized